উদ্দেশ্যহীন
একটু বাতাস, অদ্ভুত আলো, আর বহুদিন পর আমার কোনো কাজ ছিল না।
বড়োই অদ্ভুত ওয়েদার আজকে। তেমন রোদ নেই, তেমন মেঘও নেই, আবার দুটোই আছে। বাতাসও বইছে। সব মিলিয়ে অদ্ভুত একটা বিকেল। দিনটাও ভারি অদ্ভুত।
সকালে ছিল ফাইনাল এক্সাম। আন্ডারগ্র্যাড জীবনের শেষ ফাইনাল। খুবই বাজে এক্সাম দিয়েছি। তারপর বাসায় এসে ঘুমানোর কথা। কিন্তু ঘুমোতে আর ইচ্ছা করল না। মনির মামার দোকান থেকে একটা ঠান্ডা কফি নিয়ে হাঁটা দিলাম হাতিরঝিলের দিকে।
ঘড়িতে তখন পাঁচটার সামান্য কিছু আগে। আমি সাধারণত কাজ ছাড়া এদিকে আসি না। কিন্তু আজকে কেন জানি মনে হলো, আমার কোনো কাজ নেই। কারও জন্য অপেক্ষা নেই, কোনো সাবমিশনের চিন্তা মাথায় নেই, থিসিস শেষ করা লাগবে না, প্রেমিকার ঘ্যানঘ্যান নেই। জীবন নিয়ে এই মুহূর্তে কোনো চাওয়া-পাওয়াও নেই।
অনেক বছর পর একটু উদ্দেশ্যহীন হয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
অন্য সময় হলে এভাবে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে ছটফট লাগত। মনে হতো সময় নষ্ট হচ্ছে, কিছু একটা করা দরকার। আজকে তেমন কিছু লাগল না। বরং ভালো লাগল।
পাশে হাতিরঝিলের ওপর আকাশে একটা চিল উড়ছিল। মেঘ আর রোদের অদ্ভুত একটা আলো। সেই আলোয় পাশের রাস্তা দিয়ে বাস চলে। মানুষ হেঁটে যায়। গাড়ি চলে। সব চিন্তা বাদ দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তা দেখলাম।
মনে হলো, এর থেকে আনন্দের কাজ আর হয় না।
সবাই এখানে এসেছে কোনো না কোনো কাজে। কেউ এসেছে প্রেমিকার সঙ্গে, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ কাজ শেষে বাসায় যাচ্ছে। সবারই একটা উদ্দেশ্য আছে।
কিন্তু আমার কোনো উদ্দেশ্য নেই।
এরকম কতক্ষণ হয়েছে জানি না। রোদ কমে একটু মেঘ বাড়ছে দেখে আমার উদ্দেশ্যহীন দাঁড়িয়ে থাকায় বিরতি নিলাম। একটা সিগারেট পোড়াতে পোড়াতে আকাশ-পাতাল ভেবে আরও কিছু সময় পার করলাম।
বড় হয়ে এখন অনেক কাজ। মাথার ওপর সবসময় একটা চাপ। ছোটবেলায় এমনি এমনি বাইরে যেতাম, ঘুরতাম-ফিরতাম। এখন আগের মতো কোনো কারণ ছাড়া বের হই না।
কত গোল ফুলফিল করা লাগবে, জীবনে উন্নতি করা লাগবে, পিছিয়ে পড়া যাবে না। বাইরে গিয়ে এমনি এমনি সময় নষ্ট করার সময় কই?
জীবনে সবাই গতি চায়, সাফল্য চায়। সবকিছুর একটা কারণ থাকতে হয়।
কিন্তু আজকে কিছুই ছিল না।
একটু বাতাস ছিল, অদ্ভুত রোদ ছিল, রাস্তা দিয়ে বাস যাচ্ছিল।
সব যুক্তির তোয়াক্কা না করে কোনো কিছু না করে বেশ কিছু সময় পার করলাম।
আর কিছু সময়ের জন্য আমি ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।